ইউপিডিএফের সশস্ত্র সন্ত্রাসে রক্তাক্ত প্রকৃতির লীলাভূমি
কালের আলো রিপোর্ট:
একে-৪৭, একে-৫৬, একে-২২, এম-১৬, মার্ক-২ রাইফেল, এম-৪ কার্বাইন, ৪০ এমএম গ্রেনেড লঞ্চার, চায়না রাইফেল, নাইন এমএম পিস্তল, এসএলআর, এসএমজি, এলজি-কী নেই ওদের হাতে। আছে ভারী মারণাস্ত্র বিমানবিধ্বংসী রিমোট কন্ট্রোল বোমা, গ্রেনেড, হেভি মেশিনগান, জি-৩ রাইফেল, স্নাইপার রাইফেল ও রকেট লঞ্চারও। তিন পার্বত্য জেলা নিয়ে স্বাধীন জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠার কথিত আন্দোলনের আড়ালে আদতে নিরীহ বাঙালিদের জিম্মি করে চাঁদাবাজির মাধ্যমে আয়েশি জীবন ওদের। দিনের পর দিন সবুজ পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি আর মহড়া। প্রকৃতির লীলাভূমি পার্বত্য অঞ্চলকে এভাবেই রক্তাক্ত জনপদে রূপ দেয়ার অগ্রভাগে রয়েছে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। অপকর্মের ডালপালা বিস্তৃত করেছে এই পাহাড়ি দুর্বৃত্তরা।
সম্প্রতি পাহাড়ি এক কিশোরীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় রোববার (২৮ সেপ্টেম্বর) ইউপিডিএফ এর সন্ত্রাসীরা স্বয়ংক্রিয় ভারী অস্ত্রের প্রদর্শন করে। পাহাড়ের উঁচু স্থান থেকে সংঘর্ষরত জনতার উপর স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের মাধ্যমে ১০০ থেকে ১৫০ রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে। এতে তিনজন নিহত হয়েছেন। এর মাধ্যমে পুনরায় নিজেদের ভয়ঙ্কর হয়ে উঠার কথা জানান দিয়েছে বিচ্ছিন্নতাবাদী এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় বরাবরই সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠন ইউপিডিএফের পাশাপাশি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস সংস্কার), ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) ও জনসংহতি সমিতি (সন্তু লারমা বা মূল)। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে লিপ্ত রয়েছে তাঁরা। এসব সন্ত্রাসীদের হাতে সাধারণ মানুষ ছাড়াও সেনা ও পুলিশ সদস্যরাও আক্রান্ত হচ্ছেন। এখন পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন নিরাপত্তা বাহিনীর ৪২ জন সদস্য। ১০০ ছাড়িয়েছে আহতের সংখ্যা।
শান্তির জন্য পাহাড়ের সাধারণ মানুষ দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর ওপরই আস্থা রেখেছে। ফলে সেনাবাহিনীকে নিয়ে নানা কায়দা-কানুনে বিদ্বেষ ও অপপ্রচার চালাচ্ছে সশস্ত্র এই সন্ত্রাসী সংগঠন। পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে জীবনবাজি রেখে, রক্ত দিয়ে দীর্ঘ সময় যাবত কাজ করে দেশপ্রেমী এই বাহিনীটির রয়েছে ‘নন্দিত’ ও গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। তাদের উপস্থিতি ও সক্রিয় তৎপরতার কারণেই সশস্ত্র সংগঠনগুলো ফ্রিস্টাইলে অপহরণ, চাঁদাবাজি, লুটতরাজের মতো অপরাধ করতে পারছে না। তাই এই চক্রটি সাধারণ পাহাড়িদের সঙ্গে মিশে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকার অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে।
- অপকর্মের ডালপালা বিস্তৃত করেছে পাহাড়ি দুর্বৃত্তরা
- বারবার রক্তাক্ত হচ্ছে পাহাড়
- জিম্মি হয়ে পড়েছে প্রায় ১৮ লক্ষ পাহাড়বাসী
- নতুন মোড়কে ‘শান্তির দূত’ সেনাবাহিনীকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপপ্রয়াস
শুধু তাই নয় দেশের জনগণের আস্থা ও নির্ভরতার প্রতীক সেনাবাহিনীকে বিতর্কিত করে পাহাড় থেকে প্রত্যাহারের দাবি তুলছে চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসনির্ভর গোষ্ঠীটি। এই বিষয়টিকে সুগভীর ষড়যন্ত্রের বহি:প্রকাশ বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। খাগড়াছড়িতে ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্তকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তারের পরেও ইউপিডিএফ সমর্থিত ‘জুম্ম ছাত্র-জনতা’র এমন দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডা. জাহেদ উর রহমান। নিজের ইউটিউব আলোচনায় তিনি বলেছেন, ‘আমি জন্মেছি, বড় হয়েছি রাঙামাটি জেলায়। খুব ছোটবেলায় যখন শান্তিবাহিনীর প্রকোপ ছিল, তখন এই অপহরণের ঘটনার কথা শুনতাম দীর্ঘদিন। এগুলো দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল, আবার চালু হয়েছে। সুতরাং এই ভলেটাইল প্রেক্ষাপটে সেনাবাহিনী এখান থেকে প্রত্যাহার করার কোনো প্রশ্নই আসে না, এটাই ফুল স্টপ। এরপর আর কোনো আলোচনা নেই।’
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি তিন পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পর্যটকরা ছুটে এসব জেলায় আসেন পাহাড়, ঝিরি-ঝরনা আর সবুজ-শ্যামল প্রকৃতির টানে। নয়নাভিরাম বিস্তৃত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হন পর্যটকরা। কিন্তু চাঁদাবাজি, খুনোখুনি, অস্ত্রবাজি ও আধিপত্যে পাহাড়কে বারবার অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র করেছে প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। ২০০১ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি রাঙামাটির নানিয়ারচরে ডেনমার্কের উন্নয়ন সংস্থা ড্যানিডার তিন কর্মকর্তাকে অপহরণ থেকে শুরু করে সর্বশেষ চলতি বছরে বৈসাবি উৎসবে খাগড়াছড়িতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ শিক্ষার্থীকে অপহরণ সবই প্রসীত খীসার ইউপিডিএফ গ্রুপের অপকর্মের উদাহরণ। এর পাশাপাশি পাহাড়ে চাঁদাবাজি ও ভূমি দখলের লক্ষ্যে অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে পাহাড়কে অশান্ত করে তুলেছে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক), জনসংহতি সমিতি (সন্তু লারমা বা মূল) ও জেএসএস (সংস্কার)। সন্ত্রাসী এসব সংগঠনের কারণে বারবার রক্তাক্ত হচ্ছে পাহাড়। জিম্মি হয়ে পড়েছে প্রায় ১৮ লক্ষ পাহাড়বাসী। বিশেষ করে বছরের পর বছর এসব সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর কারণে অদৃশ্য শৃঙ্খলে বাঁধা ভয়, রক্ত আর নির্যাতনের ভেতর দিয়ে দিন অতিবাহিত করছেন নিরীহ সাধারণ বাঙালিরা।
গত বছরের এপ্রিলে ইউপিডিএফ (প্রসিত) চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ শিক্ষার্থীকে অপহরণের পর তাদের উদ্ধারের পাশাপাশি ইউপিডিএফ’র গোপন আস্তানায় অভিযান চালিয়ে পিস্তলের গুলি, কয়েকটি ওয়াকিটকি, জিম্মি ধরে রাখার লোহার চেন, প্রোপাগান্ডা সামগ্রী, সন্ত্রাসীদের চাঁদা আদায়ের রশিদসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করে সেনাবাহিনী। এরপর গত ২৯ জুলাই রাঙামাটির বাঘাইহাটের দুর্গম পাহাড়ে ইউপিডিএফ-এর আস্তানায় সেনাবাহিনী অভিযান চালিয়ে একে ৪৭ রাইফেলসহ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করে। নিয়মিতই এমন অভিযান অব্যাহত থাকায় এসব সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর মাথাব্যাথার কারণ হয়ে উঠেছে ‘শান্তির দূত’ বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।
- সেনাবাহিনী এখান থেকে প্রত্যাহার করার কোনো প্রশ্নই আসে না, এটাই ফুল স্টপ
ডা. জাহেদ উর রহমান
রাজনৈতিক বিশ্লেষক
বিশ্লেষকরা মনে করেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি কোনো দখলদারিত্ব নয়। এটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অংশ। এই অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ, বিজিবি ও আনসার সদস্যরা নিয়োজিত থাকলেও বাস্তবতা হলো- সশস্ত্র সংগঠনগুলোর আধুনিক ও ভারী অস্ত্রের মুখে তাঁরা অনেকটাই অসহায়। পাহাড়ে মুষ্ঠিমেয় উপজাতীয়দের গড়ে তোলা ইউপিডিএফ’র মতো সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো যেভাবে আধিপত্য বিস্তার করে, তাতে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষে এককভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এখানে রয়েছে সহায়ক ও কার্যকর শক্তি হিসেবে। তারা শুধু পাহাড়ে নয়, দেশের অন্যান্য স্পর্শকাতর এলাকাতেও দায়িত্ব পালন করে। দেশের প্রতিটি দুর্যোগে-সঙ্কটে সবার আগে এগিয়ে আসে। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর উপস্থিতিকে বারবার নতুন নতুন মোড়কে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপপ্রয়াস চালানো হয়। উদ্দেশ্য একটাই- রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করে সেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র সংগঠনগুলোর একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। এজন্য কোন ঘটনা ঘটার পরপরই পরিকল্পিতভাবে তোলা হয় সেই পুরনো আওয়াজ- ‘পাহাড় থেকে সেনা হটাও’।
সূত্র জানায়, প্রতিবেশী দেশ ভারতের ইন্ধনে সুপরিকল্পিত এই ছক বাস্তবায়নে মরিয়া হয়ে মাঠে নেমেছে বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো। এই পরিকল্পনার মধ্যে অন্যতম হলো কল্পিত ‘জুম্মল্যান্ড’ প্রতিষ্ঠা। এটি একটি কাল্পনিক ভূখণ্ড, যেখানে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, মুরং, বম, লুসাই, খিয়াং, রাখাইন, খুমি প্রভৃতি উপজাতিকে একত্র করে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের দাবি তোলা হয়। বিশেষ করে গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার লক্ষ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে করার অপচেষ্টায় এই অযৌক্তিক ও কাণ্ডজ্ঞানহীন দাবিকে জোরালো করে তোলা হচ্ছে। এমনকি ভারতের কলকাতায় আয়োজিত এক সম্মেলনে ‘জুম্মল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী’ পরিচয় দিয়ে অংশগ্রহণের ঘটনাও ঘটেছে। বাংলাদেশ সরকার এই দাবিকে সার্বভৌমত্ববিরোধী ষড়যন্ত্র হিসেবে বিবেচনা করে। সোমবার (২৯ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর পুরাতন রমনা থানা চত্বরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে গণমাধ্যমের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, একটি মহল খাগড়াছড়িতে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছে। ভারত বা ফ্যাসিস্টদের ইন্ধনে এ ঘটনা ঘটছে। তিনি বলেন, ‘আমরা সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিচ্ছি।’
কালের আলো/এমএসএএকে/এমকে








