সংসদীয় গণতন্ত্রে নতুন সূর্যোদয়, নির্বাসন থেকে রাষ্ট্রনায়ক তারেক রহমান

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ । ৬:১৫ অপরাহ্ণ

মো.শামসুল আলম খান, কালের আলো:

দলীয় রাজনীতির ভেতরের প্রথম পাঠ নিয়েছিলেন তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মমতাময়ী মা বেগম খালেদা জিয়ার কাছ থেকেই। ১৯৮৮ সালে বগুড়ার গাবতলী থেকে বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ নিয়ে আনুষ্ঠানিক রাজনীতিতে প্রবেশ করেছিলেন। কৈশোরে পিতৃহত্যা, যৌবনে কারাবাস, সেখান থেকে দীর্ঘ নির্বাসন অত:পর দেশে ফেরা, মাকে হারানোর শোক বুকে চাপা দিয়ে দলকে নেতৃত্বে দিয়ে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়। এরপর দেশের হাল ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। নির্বাসন থেকে রাষ্ট্রনায়ক তারেক রহমান আজ দেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে তাঁর অবস্থান। মায়ের পথ অনুসরণ করে, কিন্তু নিজের অভিজ্ঞতার আলোয় গড়া এক ভিন্ন অধ্যায়ের সূচনা করলেন তিনি। মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) দেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের এক নতুন সূর্যোদয় ঘটেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

তারেক রহমানের যাত্রা কেবল ব্যক্তিগত উত্থান-পতনের গল্প নয়। এটি বাংলাদেশের রাজনীতিরই প্রতিচ্ছবি-যেখানে শোক শক্তিতে রূপ নেয়, নির্বাসন প্রত্যাবর্তনের স্বপ্ন জাগায়, আর ইতিহাস কখনও সরলরেখায় এগোয় না। নির্বাসন থেকে রাষ্ট্রক্ষমতার দোরগোড়ায়-এই পথচলা প্রমাণ করে, রাজনৈতিক জীবনে শেষ শব্দ বলে কিছু নেই। কখনও কখনও দীর্ঘতম রাতের পরই ভোর সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যে কোনো সিদ্ধান্ত বা পরিবর্তন সরাসরি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সাম্প্রতিক অধ্যায় নতুন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। ১৭ বছর নির্বাসিত জীবন পার করে দেশে ফেরার মাত্র ১ মাস ২৫ দিন পরই দলের চেয়ারপারসন তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী পদে অভিষিক্ত হয়েছেন, যা রাজনৈতিক মহলের চোখে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার নতুন সূচনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনে মায়ের সঙ্গে রাজপথে সক্রিয় হন তারেক রহমান। ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের পর গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিএনপির পুনরুত্থানের সময় তিনি সংগঠনের তৃণমূলে কাজ করেন। ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে স্থানীয় সমস্যা ও সুশাসন নিয়ে গবেষণার জন্য ঢাকায় একটি রাজনৈতিক অফিস স্থাপন করেন; যা পরে ‘হাওয়া ভবন’ নামে পরিচিত হয়। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠনের পর আনুষ্ঠানিক পদে না থাকলেও তিনি হয়ে ওঠেন দলের সবচেয়ে প্রভাবশালী সংগঠক। ২০০২ সালে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদে উন্নীত হন। সমর্থকেরা বলেন, তিনি ছিলেন আধুনিক সাংগঠনিক রাজনীতির স্থপতি; সমালোচকেরা বলেন, ‘ক্ষমতার অদৃশ্য কেন্দ্র’। এই দ্বৈত ভাবমূর্তিই তার রাজনৈতিক জীবনের প্রাথমিক পরিচয় তৈরি করে।

২০০৭ সালে জরুরি অবস্থার সময় দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার হন তারেক রহমান। একাধিক মামলায় অভিযুক্ত হয়ে কারাবন্দি হন। বিএনপি অভিযোগ করে, রিমান্ডে নির্যাতনে তার শারীরিক অবস্থা ভেঙে পড়ে। ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে জামিনে মুক্তি পেয়ে স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও মেয়ে জাইমাকে নিয়ে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান, যা পরিণত হয় প্রায় ১৭ বছরের নির্বাসনে। এ সময়ে দেশে বিএনপি পড়ে ইতিহাসের অন্যতম দুঃসময়ে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কাছে পরাজয়, আন্দোলনে দমন-পীড়ন, খালেদা জিয়ার কারাবাস; সব মিলিয়ে দলটি কার্যত নেতৃত্বহীন হয়ে পড়ে। সেই শূন্যতা পূরণ করেন লন্ডনে অবস্থানরত তারেক রহমানই। ভিডিও কনফারেন্সে বৈঠক, নির্দেশনা ও বক্তব্য দিয়ে তিনি দূর থেকেই দল পরিচালনা করেন। ২০১৮ সালে খালেদা জিয়া কারাবন্দি হলে তিনি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হন। নির্বাসনেই থেকে বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো ধরে রাখেন; যা পরে তার প্রত্যাবর্তনের রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করে।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়। মামলার সাজা বাতিল ও আইনি বাধা দূর হলে দেশে ফেরার পথ খুলে যায় তারেক রহমানের। ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর ঢাকায় ফেরেন তিনি লাখো কর্মী-সমর্থকের অভ্যর্থনায়। সেদিন রাজধানীতে লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতি যেন জানিয়ে দেয়-নির্বাসনের অধ্যায় শেষ, শুরু নতুন পথচলা। কিন্তু নির্মম নিয়তি আবারও আঘাত হানে। দেশে ফেরার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় মারা যান খালেদা জিয়া। একদিকে মায়ের শোক, অন্যদিকে দলের পূর্ণ দায়িত্ব-দুইয়ের ভার কাঁধে নিয়ে তিনি সামনে এগিয়ে যান। শোক ও দায়িত্ব একসঙ্গে কাঁধে নিয়ে ৯ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির চেয়ারম্যান হন তিনি।

নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পর বিএনপির সাংগঠনিক ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত সিলেট থেকে তারেক রহমান জাতীয় সংসদ নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন। পরে তিনি বিভিন্ন বিভাগ ও জেলায় জনসভায় অংশ নেন। নির্বাচনের দুই দিন আগে রাজধানীতে ১৪টি পথসভায় অংশ নিয়ে সরাসরি ভোটারদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। প্রচারপর্বে তিনি ধর্ম, দল ও মত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং স্থানীয় সমস্যা ও প্রত্যাশা শোনেন। দলীয় নেতারা দাবি করেন, এই সরাসরি যোগাযোগ ভোটারদের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি করে এবং নির্বাচনে বিএনপির পক্ষে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ২৯৭ আসনের মধ্যে ২১২টি আসনে জয় পায়, যা দলটির জন্য নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করে। এই প্রথম তারেক রহমানের নেতৃত্বে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয় দলটি। তিনি ঢাকা ও বগুড়ার দুটি আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রধান হিসেবে তিনিই প্রধানমন্ত্রী পদে বসছেন।

নির্বাচনের ফলাফলের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন ও গেজেট প্রকাশের পর মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বেলা সাড়ে ১১টায় জাতীয় সংসদ ভবনের শপথ কক্ষে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ নেন। সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ান প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। বিকেল ৪টায় জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান এবং মন্ত্রিপরিষদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠিত হয়। এ অনুষ্ঠানে শপথ বাক্য পাঠ করান দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন। সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় নতুন সরকারের শপথ আয়োজন এই প্রথম। এর মধ্য দিয়ে নতুন সরকারের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। এক পরিবারের তিন সদস্য রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ে দায়িত্ব নেওয়ার ঘটনাটি রাজনৈতিক অঙ্গনে বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে। আগামী পাঁচ বছরের জন্য তিনি দেশের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবেন। তার নেতৃত্বে সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রিপরিষদ সদস্যরা সরকারের কার্যক্রম পরিচালনা করবেন জুলাই যোদ্ধাদের হাতে গড়ে উঠা নতুন বাংলাদেশকে। দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েন, প্রবাসে নেতৃত্ব, সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং নির্বাচনী বিজয়; সব মিলিয়ে তারেক রহমারের প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন দেশের নজর থাকবে নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তার নেতৃত্ব কতটা কার্যকর হয়, তার দিকে।

নির্বাচন জয়ের পর প্রথম বক্তব্যে তারেক রহমান জানান, দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই হবে সরকারের মূল লক্ষ্য। প্রতিশোধের রাজনীতি নয়; ন্যায়পরায়ণতা ও জবাবদিহিতার রাষ্ট্র গড়ার আহ্বান জানান তিনি। তার ভাষায়, ‘আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা না গেলে আমাদের সব চেষ্টা ব্যর্থ হবে। সরকারি-বিরোধী সব নাগরিকের জন্য আইন সমান। নির্বাচনকালীন বিরোধ যেন প্রতিহিংসায় না রূপ নেয়, এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।’

নির্বাচনের আগে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম রয়টার্সকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান বলেন, ‘প্রতিশোধ দিয়ে ভালো কিছু আসে না। এখন দেশের জন্য প্রয়োজন শান্তি ও স্থিতিশীলতা।’ তিনি ভিন্নমত ও ভিন্ন দলের সহযোগিতা কামনা করে বলেন, ‘গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের মতোই এবার দুর্নীতি দমন ও জবাবদিহিমূলক শাসন প্রতিষ্ঠায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।’ দেশে ফেরার পর বাসের ভেতর থেকে সড়কজুড়ে ভিড় করা জনতার উদ্দেশে তারেক রহমানের হাত নাড়ার দৃশ্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও জায়গা করে নেয় ।

নির্বাসন থেকে রাষ্ট্রক্ষমতায় তারেক রহমানের এই যাত্রা প্রমাণ করে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেষ বলে কিছু নেই। কখনও কখনও দীর্ঘতম রাতের পরই সবচেয়ে উজ্জ্বল ভোর আসে। তিনিই এখন বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। যার শপথ হয়ে গেলো ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬। ইতিহাসে অবিস্মরণীয় একদিন।

কালের আলো/এমএসএকে

 

প্রিন্ট করুন